সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

জুবিন ঘোষ -এর কবি পরিচিতি, কবিতাভাবনা ও কবিতা

জুবিন ঘোষ
কবি পরিচিতি
জুবিন ঘোষ (জন্ম- ২১ শে আগস্ট, ১৯৮২) শূন্য দশকের শব্দশিল্পী। শিক্ষাগত যোগ্যতা – BHM, MBA এবং MBMTech। কবিতা লেখার শুরু ২০০০ সালে। কবিতা লেখার জন্য জুবিন ঘোষ নিখিল ভারত বঙ্গ-সাহিত্য সম্মেলন থেকে ২০০৪ সালে “সরবভারতীয় প্রিতিপ্রসার পুরসকার” ও “একাডেমী অব বেঙ্গলি পোয়েট্রি” থেকে “সারস্বত সম্মান ২০০৯” পুরস্কারে সম্মানিত হন। পেয়েছেন “নিরুক্ত” সম্মান। বিভিন্ন সময় কবি সম্পাদনা ও সহসম্পাদনা করেছেন – ক্ষেপচুরিয়াস, আজকের অনির্বাণ পত্রিকা, সংবাদ সাতদিন, আমাদের পরিবার, এক্সক্লুসিভ হেডলাইনস, স্পার্ক, এখন প্রতিচ্ছবি, ছোটদের রঙধনু (বাংলাদেশ) প্রভৃতি পত্র-পত্রিকা ও সংবাদপত্র। বরতমানে ক্ষেপচুরিয়াস নামে প্রিন্টেড ম্যাগাজিন ও আজকের অনির্বাণ পত্রিকা নামে একটি পাক্ষিক ট্যাবলয়েড পত্রিকা সম্পাদনা করছেন। এছাড়াও তিনি www.khepchurians.blogspot.in একটি ওয়েবজিন সম্পাদনা করেন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থঃ ১। মেগাস্থিনিসের খাতা; ২। যে কোনও অপশাসনের বিরুদ্ধে।

জুবিন ঘোষের কবিতা-ভাবনা
ছোট কবিতার তত্ত্ব


মনজগৎ ও কবিতার মধ্যে সম্পর্ক অনেকটা একটা মর্মান্তিক মন্থন-দৃশ্যের জন্য তৈরি হওয়া দেবতা ও অসুরের দড়ি টানাটানি, মনজগতে প্রত্যাশা আর হতাশার মাঝামাঝি থেকেই কবিতার সামনে দাঁড়াতে হয়, হয় ধ্বংস করবে নয়তো নব কোনও দৃশ্যের গঠন। কবি হলেন সেই ভীষ্মের পতনের মতো একটি আকাঙ্ক্ষা, নিজের প্রপৌত্রের হাতে শত তিরবিদ্ধ হয়ে শরশয্যায় শায়িত হয়ে দেখতে হয় যাবতীয় কিছু। কবিকেও বহু কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা মৃত্যুর বিনিময়ে সমস্ত বিষাদ-হর্ষ-অনুভূতিকে সাক্ষি রেখে শব্দবাণে প্রপিতামহের শয্যার পাশে দাঁঁড়াতে হয় — এই কুরুক্ষেত্রের মাটি কালের গর্ভে মিলিয়ে যেতে পারে জেনেও। নিজের লেখা শব্দকেও সেইভাবেই কাটতে হয়, যেভাবে অর্জুনের তিরকেও কেটে বসতে হয়েছিল নিজের প্রপিতামহের দেহের ওপর। কবি, যেন ঠিক সেই নীলকণ্ঠ, গরলের পেয়ালা হাতে দাঁড়িয়ে। এই দাঁড়ানোটা কিন্তু মামুলি ব্যাপার নয় — এই দ্বন্দ্বটাও তো এক প্রকার ক্রুসেড।

কবিতাই কবির ঈশ্বর। ভিক্ষা-ভাণ্ডারটি হাতে করে কবি সেই কৌপিন পরিধান করেই মাধুকরী সংগ্রহ করে যান। পাঠকের সামনে কবি নগ্ন। নিজের সামনেও নিজে উলঙ্গ, স্বচ্ছ। সত্যের অপলাপের সামনে নিজে কৌপিন পরেও যেন সেটি অসত্যের নিকট বর্মসম হয়ে ওঠে। কোনও অসত্য বর্ম ভেদ করতে পারে না, কোনও কপট শর, লোভ, আত্মদাম্ভিকতা কবিকে ছুঁতে পারে না। তার কবিতা জীবনী যাপনে নয়, কবিতায় মোচন হবে। শব্দই তার আরাধ্য। নোবেল সাইলেন্স এর মতো চুপ করে কবি বারবার ফিরে যাবেন নিজের কাছে বাহ্য-ভাবনা থেকে আত্মসমাধিতে। কবি নিজেই বিশাল হিমবাহ, তিন-চতুর্থাংশ সেখানে অতলে বীজ বপন করে যাচ্ছে, মনের চরণামৃত ধারণ করে আর শুধু একটুখানি বাহির থেকে উঁচু হয়ে সন্ধান করছে সঞ্জীবনী স্পর্শ। আর এইভাবে ছোট কবিতা সৃষ্টি হয় অনেকগুলি বাজে লেখার মধ্যে একটি যেন ঠিক ছদ্মবেশী নারায়ণ ঝুলিতে সোনার ধান নিয়ে হাজির।

জুবিন ঘোষের ছোট কবিতা


ছবি


আমার মা আজও একটা টিকটিকিকে আড়াল করে রাখেন।


আদিম জলাশয় তীরে


এ কেমন জলাশয় দাঁড়িয়ে দ্বিপদে
কেবল জলাজঙ্গল, সুপ্রাচীন গোলকধাঁধা

পথ যদি বা পাওয়া যায় আলগা মাটি
যদি বা পাওয়া যায় পথ সমূহ আশঙ্কা

চারদিকে সার সার কোমল পতাকা
যেন কোনও জয়তোরণ দাঁড়িয়ে নিকটে


সুপর্ণার ক্লাসঘর


এমন কিছু বড় নয়
তেমন কোনও নেশাও নেই
অথচ, সুপর্ণার ক্লাসঘর।

যেমন স্বাভাবিক খুনসুটি
হেলে যাওয়া হোয়াইট বোর্ড, নড়বড়ে টুল
পিছু ডাকা স্যার

তবুও এটা সুপর্ণার ক্লাসঘর


ভেল-পুরী


আজ আমার খুব ভেলপুরী খেতে ইচ্ছে করছিল

বুঝলাম
প্রেম চলে গেলেও ভেলপুরি খাওয়া দোষের না


বেড়ালের ক্ষুদ্রান্ত্র


আমার মৃতের পাশে ঠাঁই নেয় কাঠের একমাত্র পরিণতি
চিতায় ছড়িয়ে দিও কিছু জিয়ল মাছ
যাদের পাখনায় ছিটকে যাবে চেলা কাঠ, খাবি খাবে আগুনে
তাই জন্যেই বেড় বাড়িয়েছি, যাতে কোনও মাছ
দুই বিশ্বকে অতিক্রম না-করতে পারে


পুণ্যস্নানযাত্রী

আমায় অপাপবিদ্ধ করে ফেলতে চাইছ তুমি
বুঝতে পেরেও যদি আমি কখনও সখনও
একটু আধটু পাপের মুখ দেখে আসি
তারপরেও আমার মুখের কুলুপের দিকে তাকিয়ে
মুগ্ধ চেয়ে থাকবে ?

এই তো সেই হেসে ওঠার পালা অপাপবিদ্ধ আর্তি, স্নিগ্ধ চোখে
তখনও তুমি গঙ্গার জল – আমি প্রতিদিন পুণ্যস্নানযাত্রী।


স্কার্ট

তোমার স্কার্ট হাওয়ায় জয় পতাকা তুলে সন্ধ্যারতি করে
দাউ দাউ ধুনো – কে বেশি ধন্য ! আমি না ভগবান ?


আয়নার সামনে                      

এবার নৌকার ভূমিকা কমিয়ে আনো মাঝী
একবার বুক ও বাঘের মাঝখান দিয়ে হাঁটলে
শরীরে চাঁদ কমে, জিভ বেড়ে যায় স্বাদের
গরু খেয়ে কাদা উঠে আসে।
থাবা ছেড়ে আসা করুণ বাঘের গুজব
সারা গ্রাম জুড়ে আদুল দুলুনি
সুন্দরবন সিল্ক স্মিতার মৃত্যুকালীন শাড়িতে
আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়



সাইবেরিয়া
   
আমরা যারা মধ্যবিত্ত
শীতকাল এলে তাদের সাইবেরিয়া যাবার কথা মনে পড়ে

একটা ঠান্ডা বাতাসের সামনে
শীলাকে টেনে এনেছি।
বলেছি, এই তোমার সাইবেরিয়া।

কী আশ্চর্য শীলা বোঝে এখানে পেঙ্গুইন পাওয়া যাবে না
তবুও শীলা পেঙ্গুইন দেখতে চায়

১০
হাওয়া-বাতাসের দেশ

হাওয়াবাতাসের দেশ। তেলেভাজা দোকানে।  
তুমি শস্যগন্ধে শাড়ি। কে ছিলে ওখানে ?     

তুমি তেলেভাজা গন্ধে। ওখানে শস্যদেশ।
হাওয়াবাতাসের শাড়ি। ছিলে কে দোকানে ?

ভাজা-শস্যের দোকানে। শাড়ির গন্ধে হাওয়া।
ছিলে দেশ বাতাসের। কে তুমি ওখানে ?

১১
খেলা তোর মতো

আমি তোর দুপুরবেলা খেলা। উড়িয়ে চুল মুখেও।  
রোদ পোহানো সেদিন পিঠের মতোই একা।      

আমি মুখের পোহানো রোদ। পিঠে উড়িয়েই তোর।
খেলা একা মতো চুলে। সেদিনও দুপুর বেলা।

তোর রোদের মতোই মুখে। আমি ও’বেলায় একা।
চুল উড়িয়ে সেদিন পিঠের দুপুর খেলা।

সেদিন বেলা ও আমি একা। মুখে খেলা তোর মতো।
উড়িয়ে বেলার চুলে দুপুরদুপুর রোদও। 

১২
ভো-কাট্টা

তুমি কিছু তাল-কাটা ছন্দে, ঘুড়ি হয়ে যেতে গানে   
যদি সুতো ছাড়া সন্ধে জানত, খাল পার হওয়া মানে    
 
ছন্দে পার হওয়া তুমি যদি, জানতে সুতো-ছাড়া তাল       
গানে, কিছু সন্ধে-কাটা ঘুড়ি পার হয়ে যেত খাল       

খাল, পার হয়ে যেতে যেতে, তুমি সন্ধে কিছু গানে       
তাল তাল সুতো ছেড়ে জানতে, সুতো কাটা ঘুড়ি মানে…

১৩
অভিসার

শুনে ভিতর-সখার বাঁশি, মন রাধা আসা-যাওয়া  
ভাসা কৃষ্ণ প্রাণে গান বুক কামড়ে ধরল হাওয়া  

বাঁশি মন প্রাণে হাওয়া শুনে, কৃষ্ণের ভিতর ভাসা
ধরল গানে সখা বুক, রাধা-প্রাণে যাওয়া-আসা    

হাওয়ার বুকে যাওয়া-আসায়, কামড়ে রাধা মন প্রাণ
বাঁশির ভিতর সখা ধরল কৃষ্ণ কৃষ্ণ গান
        

১৪
পুরুষবক্ষ

বোতাম খোলা থাকলে জঙ্গলে আলাপ হয়

বোতাম খোলা থাকলে হু হু বাতাস আসে
জিরিয়ে রাধাজল যেন বহুদূর কোনও
পাতা-দোলা পথ চেয়ে
বসে থাকেন বন-ফেরতা শান্ত কাঠুরে।

১৫
অমৃতপাঞ্জা 

আমার অমৃতপাঞ্জায় কুসুম পিষেছি
ফুরফুরে পাপড়িগুলো গুঁড়িয়ে ঝরে
শখের শরীর ছেড়ে মুঠোর নিয়ম
উড়তে উড়তে যেই খেলে যায় বিজ্ঞাপনে
একটা আঙুল তুলেছো ভেবে আনন্দে উদ্বেল
তোমায় দেখে তিনটে আঙুল হেসেই মরে !

১৬
ক্রন্দন

যেন সাপটে ধরে সাপটা নীল পদ্মের বুকে নন্দন
ছিল আদৃত চিরনিদ্রিত গৃহ-বেড়ালের সে ক্রন্দন

১৭
ইরোস দেবতার আক্ষেপ

শরীরের কোনও প্রেমিকা থাকে না, টানটাই আসল
সবাই গোসাপের চলন-টাকে কথা ভাবে, বাসাটার কথা ভাবে না

১৮
চতুর্দশপদী

দ্বান্দ্বিক
স্কন্ধেই
বন্দির
গন্ধক।
রাষ্ট্রের
বাস্তব
একতার
সমতা

দর্শন
ধর্ষণ
আসলেই
করষণ —
মকবুল
ক্ষমতা!

১৯
চিঠি

আমি জানি, কখনও আমার রবীন্দ্রনাথ হতে ইচ্ছে করে
তোমার রাণু ; আর এইসব অভিসম্পাতে, আমি বাইশে শ্রাবণ,
তুমি কাদম্বরীর মৃত্যুর রাত …

কোন মন্তব্য নেই: