কবিতা যেরকম
– সুধীর দত্ত
– সুধীর দত্ত
![]() |
| সুধীর দত্ত |
প্রতিটা রাগের যেমন একটি রূপাবয়ব আছে,
কবিতাও কবির কাছে তেমনি রূপবান এক ভাববস্তু। রূপ একটি নির্মাণ, ভিতর থেকে
ঠেলে ওঠা একটি প্রকাশ। কী ঠেলে ওঠে? না, তার প্রতি মুহূর্তের বেঁচে থাকার
বিস্ময়, তার আলো ও অন্ধকার, তার আলো ও তাপময় একটি সংগ্রামী বেড়ে ওঠা।
সংগ্রাম এই জন্য যে, তাকে বেঁচে থাকতে হয় মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এই
মৃত্যু ঐতিহ্যের প্রথাজড়তা, অভ্যাসের গন্ডি ও প্রতিষ্ঠিত রুচিবৃত্ত। বেঁচে
থাকা মানে একই সঙ্গে অস্বীকার ও স্বীকরণ, গ্রহণ ও অগ্রহণ, ঐতিহ্যের
বিরুদ্ধে ব্যক্তি-প্রতিভার যুদ্ধ, যা ঐতিহ্যের সম্প্রসারণও। এই সম্প্রসারণে
যেমন ঐতিহ্যের ভাংচুর ও পুনর্বিন্যাস ঘটে ব্যক্তি-কবিও তেমনি বারবার
অতিক্রম করেন নিজেকে ভাষা ও ভাষ্যে, প্রসঙ্গ ও প্রকরণে।
কবি ঈশ্বরের জগৎকে ভেঙ্গে পুননির্মাণ করেন
এবং বাস করেন এই বিকল্পে, প্রতিস্থাপিত বিশ্বে। এই জন্যই তিনি ঈশ্বরের
প্রতিস্পর্ধী। আঙ্গিকের ভাঁজে ভাঁজে ফুটে ওঠে এই দ্রোহ, এই ক্রমজায়মান
স্পর্ধা, বিনির্মাণের প্রহার, ঈশ্বরীয় বিশ্বের ভেঙ্গে পড়া টুকরো ও তার
তেজস্ক্রিয় ধূলি। তার মাথার উপর নুয়ে পড়ে আকাশের ছাদ, গ্যালাক্সি আর
নীহারিকাপুঞ্জ; এই ভয়ঙ্কর উড়ানপথে কবি এক তরুণ গরুড়, যাকে ভয় পায় দেবতারাও।
তার তেজ গতি ও তীক্ষ্ণতায়। এই জাগ্রত ভূমি থেকে ভিতরের চাপে তিনি অনায়াসে
উৎক্ষিপ্ত হতে পারেন চেতনার অধিলোকে এবং অবর ভূমির নির্জ্ঞানে। তার কবিতা
এই উড়ান পথের ইতিবৃত্ত। সমাজ-বাস্তবতা এই জাগ্রতভূমির ক্ষুদ্রাংশমাত্র;
আত্মজৈবনিক ক্ষুৎকাতরতা ও তার দংশন, অবচৈতন্য থেকে বুদ্ধদের মতো জাগ্রত
ভূমিতে উঠে আসা কিছু মানবিক রক্তিমতা, ঐশী যাত্রাপথে যা কলঙ্কচিহ্নের মতো
অন্ধকারের আবেশে আলো’কে সুন্দরতর করে। কবিতা ত্রিলোকী কবির এই পাখসাট,
ডানার আওয়াজ। চেতনার মহর্লোকে কবির যে বাসগৃহ, সেখানে কবি নিজেকে অনুভব
করেন মহাপ্রাণতাময় এক সমষ্টি-মানবরূপে। তিনি সেখানে সহস্রশীর্ষ, সহস্রপাদ ও
সর্বোতশ্চক্ষু ঈশ্বর। ফলত তাঁর কবিতা বহুস্তরীয়, বহুমুখ, এবং অনেকান্ত।
ব্যাপ্তি, গভীরতা ও উচ্চতায় তা যুগপৎ ঐশী ও আদিম। তার চলন একরৈখিক নয়,
পরস্পরে অনুপ্রবিষ্ট এক কম্পমান বিপুলতা। তার ক্ষুধা সর্বগ্রাসী অপ্রশম্য ও নিরবধি।
তার পায়ের নিচে সাত পাতাল, মাথার উপর
আদিত্যলোক। অন্তরীক্ষের অজস্র জ্যোতিষ্ক তাঁর শরীর; তবুও তিনি সৃষ্টির
অতীত; কালের ভিতর দাঁড়িয়েও তিনি অতিক্রম করেছেন কালচক্র। ফলত তার কবিতা
শুধু কাল নয়, কালের অতীত আর এক কালের গল্প, যেখানে মুছে যায় সময় ও
সময়াতীতের ভেদরেখা। অতীত আর অতীত নয়, বর্তমানে পুনর্জাত হয়ে সে এক অনাগতের
আভাস, যুক্তি-তক্কের শৃঙ্খল ভাঙ্গা এক অনির্বচনীয়তা। জীবন ও মৃত্যু তখন
পরস্পরে অনুপ্রবিষ্ট এক রহস্যময় পূর্ণতা, এক আপাত-পারম্পর্যহীন বোধমাত্র।
অর্থ নয়, ধ্বনির মধ্যে নির্ঋতির অন্ধকার থেকে বিচ্ছূরিত এক তড়িত-মোক্ষণ।
কবিতা এরকমই বৈখরী ভূমিতে পরা বাকের
অবতরণ, রহস্যময় এবং ঐশী, বিনির্মিত এক নির্মাণ প্রক্রিয়া যা অনিঃশেষ এবং
ক্রমজায়মান। কবিই সেই দিব্য উন্মাদ যিনি নিত্য প্রয়াস চালিয়ে যান সেই
গুহামুখের অবরোধ ভেঙে ফেলবার, এবং বলে ওঠে-
আর যদি চিৎকার করি আকাশ ফাটিয়ে
এসো,
তোমার অঙ্গিরা-দেব পিতৃগণ, এসো
এই যে গুহামুখ তার
গোযূথ অশ্ব ও জল – জলরাশি
এক যোগে খুলে দিই, ভয়ঙ্কর সেই সুন্দরের যা সূচনা –
এসো,
তোমার অঙ্গিরা-দেব পিতৃগণ, এসো
এই যে গুহামুখ তার
গোযূথ অশ্ব ও জল – জলরাশি
এক যোগে খুলে দিই, ভয়ঙ্কর সেই সুন্দরের যা সূচনা –

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন