"একজন কবি কিংবা কোনো সৃষ্টিশীল মানুষ যতটা দার্শনিক ততটা মুখর তার্কিক নন।"
- মাহমুদ টোকন
কবিতা কেন লিখি
এ প্রশ্নের জবাব দেয়া কঠিন এবং কোনো কবি আদৌ বাধ্য নন এর জবাব দিতে। এর উত্তর দিতে তিনি এমনকি প্রস্তুতও নন সবসময়। মুক্ত দর্শনে এবং অধিকার সংরক্ষিত সামাজিক অবস্থান থেকে কোন মা যেমন বাধ্য নন যে কেন তিনি সন্তান ধারণ করেন ও জন্ম দেন। বাণিজ্য-বেশাতিওয়ালারা জবাব দিলেও দিতে পারেন। কোন সৃষ্টিশীল মানুষ কারো কাছেই সৃষ্টিকর্মের কারণ ব্যাখ্যা করতে বাধ্য থাকেন না। এটি হবে তার জন্য আত্মঘাতি। যিনি সৃষ্টি করেন বা করবেন সেটি ফরমায়েসি হলে অবশ্য জবাব হতে পারে। ফরমায়েসি কাজ আদৌ কোন সৃষ্টিশীলতা নয়। কবির spontaneous overflow of powerful feelings কবিতার জন্ম দেয়। সেখানে একজন সৎকবি ঈশ্বর মাত্র। ঈশ্বর বরং কোন কোন ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী হতে পারেন কিন্তু তাকে সে কাজ করার কারণ জানতে চাওয়া শ্রেফ বোকামি অথবা ধৃষ্টতা।
স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিংবা স্বপ্রণোদিত হয়ে কোন কবি বা স্রষ্টা তার সৃষ্টির ’কেন’টিকে সামনে আনলেও আনতে পারেন। সেটি তার নিজস্ব ব্যাপার। তবে সে ব্যাখ্যা যথাযথ হবে কি-না বা আদৌ মনুষ্যসৃষ্ট যুক্তিবাদের অ্যানালিটিক্যাল দিক থেকে মর্যাদা পাবে কি-না এতে সন্দেহ রয়েছে। কারণ একজন কবি কিংবা কোন সৃষ্টিশীল মানুষ যতটা দার্শনিক ততটা মুখর তার্কিক নন। অন্যপ্রাণিরা হলেও হতে পারেন যেমনটি- সাম্প্রতিক উন্নয়ন(!) বিশেষজ্ঞরা সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অবিরাম বাক্য-তর্কের অভিনয় করে থাকেন। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে কবিতাই বরং কবিকে লিখে। আর এই ফর্ম থেকে আসলে ’কেন’ শব্দটি মহাজাগতিক একটি কণিকামাত্র যার অবস্থান রয়েছে বটে, অনিবার্যতা চোখেই পরে না।
আমার কথা যদি বলি সংক্ষেপে বলবো যে- একধরনের বোধ ও গভীর আনন্দের জন্য কবিতা লিখি। কবিতা লিখি গভীর বেদনার জন্য। আর ব্যাখ্যাহীন অন্তর্গত কিছু অসংলগ্নতাকে রূপ দেয়ার জন্য আমি কবিতা লিখি। আর একটি কথা- এ বিস্ময়কর মহাজগৎ, সমাজ, প্রকৃতি এবং এই প্রাণিকুলের প্রতি ভালোবাসা ও ভালোবাসাহীনতার জন্য কবিতা লিখি।
সকলেই কবি নন এবং কবিতা কোনো ঐশি বিষয় নয়
প্রত্যেক মানুষ তার ভেতরে অনুভুতিসম্পন্ন ইন্দ্রিয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। ইমোশন তার সহজাত। তবে প্রকাশ এবং প্রকাশভঙ্গি আলাদা। ব্যক্তি-সমাজ-রাস্ট্র-পরিবেশ এবং পরিবারভেদে এটি আরও ব্যতিক্রমি। একই মাছ তিনজন রান্না করলে তিন রকমের স্বাদ হবে। শুধু সেটুকুই নয় পরিবেশনেও এর পার্থক্য ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। চাইলে সবাই রান্না করতে পারেন কিন্তু সেটি কে কতোটা বিশেষ দক্ষতা দিয়ে ও মনোযোগ দিয়ে করেন সেটি হচ্ছে বিষয়। কে সকল অনুষঙ্গের সামঞ্জস্য বুঝে তার ব্যবহার করেন সেটি বিবেচ্য। সর্বতোভাবে সামঞ্জস্য থাকলেই কেবল রান্নাটি সুখাদ্য হয়। সে অর্থে ‘কেউ কেউ কবি’ এজন্য যে দু’একজন-ই প্রকৃতঅর্থে শিল্পি। এজন্যই সকলে কবি নন। একথা সত্যি যে সবাই সমান মেধা ও সুযোগ নিয়ে জন্মায় না। সবাই প্রতিভার লালন সমানভাবে করেনও না। মনে রাখা প্রয়োজন এটি শরীরগত একটি বিষয়। আর মন-মস্তিষ্ক শরীরেরই অংশ। কবিতা যিনি ভালো করে আত্মস্থ করে, চিন্তা-জ্ঞানের সমন্বয়ে প্রকাশের শৈল্পিক উৎকর্ষতা লাভ করাতে পারেন তিনিই কবি।
ভালোবেসে, গভীরভাবে বুঝে অনুশীলন করে এবং দরদ দিয়ে উপস্থাপনযোগ্য করতে পারলে তবেই কবিতা। সেজন্যই কেউ কেউ কবি। নইলে সাম্প্রতিককালে যে মোহের বিস্তার দেখছি তাতে বহু রাজনৈতিক, মিডিয়াকর্মী, এনজিও কর্মী, বই প্রকাশি নাম-যশোপ্রার্থীরা এমনকি বিত্তশালী-ক্ষমতাশালী-ব্যবসায়ী সকলেই কবি হতেন। শুধু শব্দ তৈরি করে মিডিয়া বা বইয়ে প্রকাশ করলেই যেমন কবিতা হয় না, তেমনি কবিতা ভালো বুঝলে এবং কবিতা বিষয়ক ওজনদার কথা বলতে পারলেই কবি হওয়া যায় না।
একবার কথা প্রসঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কি মহামতি লেনিনকে বলেন যে, ভালো গদ্য লেখার চেয়ে পদ্য লেখা বরং সহজ কাজ। এতে সময়ও কম লাগে। লেনিন সেকথা শুনে তো রেগে আগুন। বলেন, ’থাক ও কথা আমাকে শুনিও না। কবিতা লেখা মোটেও সহজ কাজ নয়। আমি তো ভাবতেই পারি না। জ্যান্ত ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে নিলেও আমাকে দিয়ে তুমি কবিতার দুটো লাইন বের করতে পারবে না!’ লেলিন কিন্তু চাইলেই লিখতে পারতেন। সেই মেধাও তার ছিলো। কিন্তু সেটি মুখ্য নয়। বিষয়টি হচ্ছে কবিতা ও কবির প্রতি তার ধারণা ও সম্ভ্রম। এটি যে সহজ কোনো বিষয় বা ছেলেখেলা নয় এটি লেনিন দৃঢ়ভাবে বোঝাতে চেয়েছেন।
বিষয়টিকে যথাযথভাবে আত্মস্থ করে, শিল্পের কলাকৌশল জেনে এর জন্য নিবেদিত প্রাণে উৎকর্ষতা লাভ করলেই কবি হওয়া যায়। এটি আদৌ কোন ঐশী বিষয় বা আলৌকিক বিষয় নয়। আবার ক্ষমতা, পারিষদবেষ্টিত হয়ে ও অর্থসম্পদের মাধ্যমে অর্জিত (উদা: জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ) কোন বস্তুও নয়। অসাধারণ মেধাসম্পন্ন কেউ কেউ হয়ত খুব অল্প আয়াসে কবি হতে পারেন কিন্তু বিষয়টি সে-ই শরীরবৃত্তিয় অঙ্গের সুসক্ষমতা এবং সুযোগ প্রাপ্তির মানদ-ে হতে পারে। এর উদাহরন খুব কম। কবি হয়ে উঠতে হয়। মনে মেধায়, চেতনা ও অধ্যয়নের মধ্যে দিয়ে। এবং যথাযথ লেখা ও প্রকাশের মধ্যে দিয়ে।
কবিতায় ছন্দের প্রয়োজনীয়তা ও অনিবার্যতা এবং ছন্দবিমুখতা
কোনো সচেতন কবি ছন্দবিমুখ বলে মনে হয় না আমার। যিনি ছন্দ জানেন, বোঝেন তিনি কেন ছন্দবিমুখ হবেন? হতে পারে তিনি ছন্দের ব্যবহার কম করছেন বা ছন্দরীতি ভাঙছেন। গদ্য কবিতায়ও স্পষ্ট ছন্দের ব্যবহার রয়েছে। হয়ত ছন্দ কবিতায় প্রকট হয়ে ওঠেনি। কথা হচ্ছে, যিনি ছন্দ জানেন তিনি ছন্দকে ভাঙতেও জানেন। অন্যফর্মে তার ব্যবহারও জানেন। যার ধারণা নেই তিনি ছন্দবিমুখ হলেও হতে পারেন। আপনি যদি পল এলুয়ার এবং বোদলেয়ারের কবিতা দেখেন এর ষ্পষ্টতা দেখবেন। দুজনই তীক্ষè, ক্ষুরধার। ঠিক রবীন্দ্রনাথ এবং জীবনানন্দ একই রকম। ওনারা সবাই প্রাজ্ঞ কিন্তু ব্যবহারে একেকজন তার নিজের মতো। আলাদা।
সম্প্রতিক সময়ের কবিদের মধ্যে ছন্দবিমুখতার কোন ছাপ দেখছি না। বরং ছন্দকে চমৎকারভাবে মাইল্ডলি ব্যবহার করতে দেখি। আর যারা ছন্দ কী জানেন না, তারা বিমুখ হবেন, এটি সেটিও চোখে পড়ে। প্রকৃত ছন্দ জানা কবি ছন্দবিমুখ বলে আমার মনে হয় না। যেমন অনেকে ভালো ইংরেজি জানেন কিন্তু এড়িয়ে যান, অনর্গল বলেন না। তার মানে এই নয় সে বিমুখ। সে বাংলা বলেন, এখানে সে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন কিংবা তিনি বাংলায়ই বলতে চান। এটি ব্যক্তির ওপর। তবে বিমুখতা বলতে আমি অপছন্দ করা এবং বিরোধীতাকে মনে করি। কোনো কবি এমন আছেন বলে আমার মনে হয় না। ছন্দ হচ্ছে গানের স্বারগাম এর মতো। জেনে তবে আপনি গান গাইতে পারবেন। গলার এবং সুরের ও কথার ব্যবহার করেত পারবেন ইচ্ছে মতো। ফর্ম ভাঙাগড়ায় নিজেকে উৎকর্ষতা দিতে পারবেন।
কবিতার জন্য ছন্দ কতোটুকু প্রয়েজন এর জন্য কোনো ছন্দমিটার নেই। তবে ভালো গদ্যকবিতা লিখতে হলেও কবিকে অবশ্যই ছন্দের ধারণা থাকা দরকার। এজন্য যে ছন্দের ব্যবহার জেনেই ব্যবহার না করার উৎকর্ষতায় পৌঁছনো সম্ভব। আব্যশকতাটি এখানেই। আগে অনেকেই হয়ত এ বিষয়ে পড়ালেখা করেননি কিন্তু ব্যবহারের মাধ্যমে তারা এটি অর্জন করেছেন। আমি বলবো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার-স্যাপার এক্ষেত্রে সবসময় মুখ্য নয়। মুখ্য হলো কবি এটি জানেন, বোঝেন কি-না। জানলে, কবিতায় আরো ভালো করে এর ব্যবহার বা পরিহার করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে আবশ্যক অনাবশ্যক বিষয়গুলো শ্রেফ কবির ওপর। ছন্দ জানলে, বুঝলে এটি প্রতিবন্ধকতার কোনো বিষয় হতে পারে না। এটি সাপ নয় যে ভালো সাপুরে হলেও, সাপ তার মৃত্যুর কারন হতে পারে!
কবিতায় ‘দশক’ ভাবনা, নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপদান ইত্যাদি আমি আসলে ’দশক’ বিষয়টি আদৌ গ্রহণ করি না। তবে দেখা গেছে সর্টিং করার ক্ষেত্রে একটি দরকার হয়। বছর দু’য়েক আগে কোলকাতার একটি লিটলম্যাগে ভারতীয় (বিশেষকরে পশ্চিমবঙ্গ) বাঙালি ও বাংলাদেশের ’৯০-এর কবিদের নিয়ে একটি সংখ্যা করে। তো সম্পাদক মহোদয় আমাকে বাংলাদেশের দায়ীত্ব নিতে বলেন। আমি বলেছি যে এটি আমার জন্য নয় কারণ দশক দিয়ে আমি কবিকে ভাগ করতে পারি না। উনি বলেছিলেন যে উনিও সেটি করেন না। তবে নব্বই এর দশকে যারা কবি হিসেবে প্রকাশিত তাদেরকে সহযে চিহ্নিত করা ও প্রকাশ করার জন্য এটি হতে পারে। কারণ একসঙে সকল বাঙালি কবির কবিতা ওই ছোট পত্রিকাটিতে প্রকাশ করা খুবই কষ্টকর এবং ব্যয়বহুল। ফলে ওই নির্দিষ্ট সময়ে যারা আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তাদের আমরা সহজে গ্রন্থভুক্ত করতে পারি। এটি হলেও হতে পারে। তবে এপথ নির্বাচনের জন্য সহজ নয়। কারণ বেশিরভাগ কবির আত্মপ্রকাশ অগোচরে হয়ে থাকে।
আপনি যদি বাংলা কবিতার উত্তোরণ ও প্রকাশের সময়কাল বলেন তাহলে ঠিক আছে। এভাবেও আসলে চিহ্নিত করা কঠিন। বাংলা কবিতার জন্য প্রাচীনকাল থেকে এখনকার সময়টুকুও গুরুত্ত্ব বহন করে। প্রাচীনকালের লুইপা, কাহ্নপা থেকে এমনকি আজকে প্রকাশিত কবিও এখানে উল্লেখযোগ্য। বিষয়টি হচ্ছে প্রকাশের এবং উত্তোরণের। আমরা কতটুকু অগ্রগামি হতে পেরেছি। কতটুকু কবিতায় আছি, এর বিস্তার এবং মান, এর চর্চা এবং প্রকাশ কতটা উৎকর্ষতা লাভ করেছে। দশক থেকে আমার কাছে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সার্থক কবি ও কবিতার প্রকাশ।
আমি কবিতাকে দেখি অন্তর্গত ঐশ্বর্য দিয়ে। সেখানে নিজের সামর্থটুকু উপস্থাপন করতে চাই নিজের মতো করে। তাতে কখনও কারো কারো প্রভাব থাকে, তাকে অতিক্রম করার শক্তির ব্যবহারও থাকে। আমি দায়বদ্ধতা, দায়হীনতা ও গভীর আনন্দ-বেদনাকে আশ্রয় করে কবিতা লিখি। তার ছাপ রয়েছে আমার কবিতায়। তবে আলাদাকরে চিহ্নিত করার বিষয়টি নিয়ে নিজে ভাবিনি। কোনো কবিতা গভীর বেদনার ভেতর দিয়ে এমনকি কাঁদতে কাঁদতে লিখেছি। চোখের জলের চিহ্ন সেখানে নেই কিন্তু অ্যাগোনিটুকু রয়ে গেছে। আবার কোনো কবিতা অনাবিল আনন্দের মধ্যে লিখেও সেখানে গভীর আনন্দটুকু ধরতে পারিনি। শিল্প এরকমই। নিজের কবিতার উপাদান চিহ্নিত করার দায়ীত্ব কবির নিজের নয়। এটি পাঠকের, কবিতা সমালোচকদের।
প্রেক্ষিত এবং ঘটনা প্রবাহে দেশভাগের পরে পশ্চিমবাংলা এবং বাংলাদেশের কবিতার পার্থক্য এবং ঘটনার প্রভাব
দেশভাগ অর্থ্যাৎ ভারত ভাগ হলো ’৪৭ এ ভারত ও পাকিস্তান নামে। তারপর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো পাকিস্তানি উপনিবেশ থেকে। বলা ভালো- জীবন দিয়ে, অত্যাচার সয়ে, ত্যাগ স্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তানী শাসক হায়েনা ও তাদের এদেশী সহযোগিদের পরাজিত করেছি। স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আদর্শ। জিন্নাহ, নেহেরু এরা নিজেদের স্বার্থে ভারতবর্ষকে ধর্মের চাতুরিতে ভাগ করেছিলেন। ওই দু’ব্যক্তির একজনও বাঙালি ছিলেন না। সেজন্য তারা বাঙালিদের স্বার্থও দেখেননি। বরং বাঙালিদের কৌশলে বিভাজিত করেছেন। বাঙালিদের হঠিয়ে সামনে এসেছেন। আর বেনিয়া র্যাডক্লিফ এর ছুড়িটি শানানো ছিলোই বাঙালিদের কেটে ভাগ করার জন্য। কারণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙালিরা এবং পাঞ্জাবিরা অধিংকাশক্ষেত্রে প্রতিরোধ এবং আন্দোলনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে সেজন্য হিংসা চরিতার্থ করতে ইংরেজরা বাংলা এবং পাঞ্জাবকে টুকরো করেছে। তার অর্ধেক নিয়েছিলো জিন্নাহ, অর্ধেক নেহেরু। আরও একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ভারত এবং পাকিস্থান স্বাধীনতা অর্জন করেনি। স্বাধীনতা তারা অনেকটা দান হিসেবে পেয়েছে। ‘ঠিক যেনো পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’। আর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। জীবনদান, অত্যাচার এবং নারীর সম্ভ্রমহানীর বহুবেদনা রয়েছে। এসবের বিনিময়ে লড়াই কওে জনযুদ্ধেও মাধ্যবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সুতরাং এর একটি বিরাট সিগনিফিকেন্স কিন্তু রয়েছে। স্বাবাভিকভাবেই বাংলাদেশের কবিতায় ও সাহিত্যে এর প্রভাব থাকবে। কারন সমাজ, প্রকৃতি এবং জীবন হচ্ছে সকল শিল্পের মুখ্য উপাদান। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাঙালিদের অর্থ্যাৎ বিভাজীত বাঙালিদের কবিতায় অবশ্যই মৌলিক পার্থক্য সূচিত হবে। কবিতা সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করেই উৎসারিত যার মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, রাস্ট্র, পরিবেশ এবং অন্যান্য অনুসঙ্গগুলো প্রকাশিত হয়।
মনে রাখতে হবে ’৪৭ এর ভাগাভাগির ফলে যারা ওপারে গিয়েছেন তারমধ্যে বাংলাদেশের অনেক সাংস্কৃতিক পরিবার চলে গিয়েছেন। এদের মধ্যে কবি-সাহিত্যিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। যদি আপনি ওখানকার কবি-সাহিত্যিকদের লক্ষ্য করেন বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কিন্তু ওপার থেকে যারা বাংলাদেশে এসেছেন সে তুলনায় কবি-সাহিত্যিক অনেক অনেক কম। আর তাদের মধ্যে অনেকে মেধাবী ছিলেন না কেবল শূন্যস্থান পূরণ করেছেন তা-ও কিন্তু এখন স্পষ্ট। যাহোক সে কারণে আমাদের স্বাধীনতার মতো একটি বিশাল অর্জনের পরেও আমাদের এখানে যে পরিমাণ পরিবর্তন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বিশেষকরে কবিতায় হতে পারতো তা হয়নি। তা থেকেও বড় বিবেচ্য বিষয় আমাদের সাংস্কৃতিতে বিরাট কালোছায়া, সূদীর্ঘ সামরিক শাসন এবং স্বৈরশাসন। ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে সামরিক শাসনের মধ্যে দিয়ে আমাদের বরং প্রগতির ধারাকেই রুদ্ধ করা হয়েছে। সিনেমা, গল্প-উপন্যাস, সঙ্গীতসহ অন্যান্য সংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোসহ কবিতা সেখানে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দীর্ঘকাল কোন দেশ সামরিক বা স্বৈরশাসন এর কবলে থাকলে সেখানে সর্বস্তরে মূল্যবোধের ধ্বস নামে। প্রগতিশীলতা খুন হয়। যার স্খলন আমরা দেখছি আমাদের শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পিসহ অন্যান্যদের মধ্যে।
আরেকটি বিষয় এর সাথে জড়িত যেটি ফিলোজফিক্যালি এবং সমাজবিজ্ঞানের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া এবং একরৈখিক বিশ্ব তৈরি হওয়া। সোভিয়েত রাশিয়া সারাবিশ্বে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করেছিলো। কিন্তু সেই জ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগসমূহ থমকে পরে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনে আমেরিকা ও পুঁজিবাদের প্রদত্ত কনজুমারিজম লকলকেভাবে বিশ্বকে গ্রাস করে। আর আমাদের মতো অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল এবং শিক্ষা-প্রযুক্তিতে পেছনে থাকা দেশগুলো এতে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে বাংলাদেশের কবিতা, নাটক, সিনেমা, সাংবাদিকতা ইত্যাদিসহ শিল্প-সাহিত্য এবং রাজনীতি প্রবল সম্ভাবনা স্বত্ত্বেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমরা আমাদের কাঙ্খিত স্তরে পৌঁছতে পারিনি। সত্যি বলতে কি, দেখবেন যারা এখানে শিল্প-সাহিত্যের মডেল হতে পারতেন তারাই বরং ধনীক শ্রেণীর প্রতিভূ হয়ে বসেছেন। অর্থ্যাৎ সেই সুদীর্ঘ অপশাসন আর পুঁজির গন্ধম কবি-সাহিত্যিকদের সামগ্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার দিকে থেকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে অনেক বেশি। বাংলাদেশ শিক্ষা, যোগাযোগ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসহ অনেকক্ষেত্রে দারুন অগ্রগতি সাধন করেছে। কিন্তু সংস্কৃতি তথা সার্বিক মূল্যবোধ এখানে ভীষনরকম ক্ষতগ্রস্থ। বিশাল অর্জনও এরফলে ম্লান হয়ে পড়েছে বিভিন্নভাবে।
পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতীয় বাঙালীদের ক্ষেত্রে তারা যতটুকু পৌঁছবার কথা সেটি না পৌঁছলেও সাহিত্যে বিশেষকরে কবিতায় তারা নিশ্চয়ই কিছুটা প্রভাব ফেলতে পেরেছেন ওই পরিবর্তনগুলোর, সময়ের। আর ভারতে রাস্ট্রিয় চরিত্রের কাঠামোতে পড়ে অন্যান্যদের মতো বাঙালিরা সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে উঠে আসতে পারেনি। কবিতা তথা সামগ্রিক সাহিত্যের অর্জনেও সেখানে ছেদ পড়েছে। ভারত রাস্ট্রিয়ভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠায় তাদের মধ্যে সুবিধাবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের কৌশল ডালপালা মেলেছে। এর প্রভাব কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখক-সাহিত্যিকদের মধ্যেও সংক্রমিত হবে এটিই স্বাভাবিক।
সাম্প্রতিক কবিতার দুর্বোধ্যতা এবং জনবিচ্ছিন্নতা
কবিতা নয় বরং শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমগুলোও এ অভিযোগের বাইরে নয়। আর সারা পৃথিবী জুড়েই এই আঙুল উঠেছে। কিন্তু পাঠকেরা কি সেই আগের পাঠক রয়েছেন? তারা কি কবিতার জন্য সময় দিচ্ছেন। কবিতা আত্মস্থ করতে তারা কি গুরত্বেও সঙ্গে বিষয়টিকে গ্রহণ করছেন? আগে বিনোদন ও শিল্পের প্রচার মাধ্যম ছিল অনেক কম। আর মানুষ ক’টা বই বা ম্যাগজিন হাতের কাছে পেতো? পাশাপাশি মানুষের কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিধী ছোট থাকায় অখ- অবসরও ছিলো। ফলে একটি বিষয় বা পুস্তকের অধ্যয়ন অধিকবার হওয়া ছিল অনিবার্য। আর সে সময়ে কিন্তু বাংলা কবিতায় বিষয়বৈচিত্র কম ছিল। দূরবর্তী জানালাটিও আজকের মতো খোলা ছিল না। আপনি যদি দেখেন একশ বছর আগে লেখা বোদলেয়ার, মালার্মে, র্যাবো, জীবনানন্দ আজও কী খুব সহযে আত্মস্থ করা যায়? আজকের কবিরা কিন্তু সে-ই দূরবর্তী পাঠটি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে পড়তে পারছেন, উপলব্দি করতে পারছেন এবং নিজে লিখতে পারছেন। সে সময়ের অনেক কবিই এ সুযোগগুলো পাননি। তাতে তারা কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যেই থেকেছেন। আজ যদি আপনি নজরুলের কবিতা পরেন তাহলে তার কটি কবিতাকে আপনি কালোত্তীর্ণ বলবেন? কিন্তু সেগুলো কম জনপ্রিয় নয়। সময়ের প্রয়োজনে তার অনেক কবিতাই বিস্ফোরক। এবং কবিতা ও লেখার জন্য ব্রিটিশদের হাতে তিনি কম নিগৃহিত হননি। তবুও কবিতাকে শিল্পের বিবেচনাবোধেই টিকে থাকতে হয়।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে সেলফোন, টেলিভিশন, ল্যাপটপ ও সোশ্যালমিডিয়া আর ইন্টারনেট বিনোদনের মাধ্যমে পাঠকরা এতোটাই এনগেজ হয়ে পড়েছেন যে কবিতার জন্য তার যথেষ্ট সময় কোথায়? আরও একটি বিষয় বিবেচ্য যে সোশ্যাল মিডিয়া রেসপনসিভ। ’লাইভ’ অনেক সস্তা বিনোদনও সেখানে রয়েছে। একটি বিশেষ সেকশন অর্থ্যাৎ যারা বই পড়ে তারা এই মোহে আবদ্ধ। আমার মনে আছে খুব ছোটবেলায় আমি রোজা রাখতাম। আর সেসময় সময় কাটত উপাসনা নয় বরং বড় বড় উপন্যাস, গল্প এবং প্রবন্ধ পড়ে। মনে আছে এডলফ হিটলার-এর মেনক্যাম্ফ এবং বিমল মিত্র-এর কড়ি দিয়ে কিনলাম এর মতো বই আমার ৮-১০ বছর বয়সে পড়া। ফোন, টেলিভিশন, নেট না থাকায়ই হয়ত তা সম্ভব হয়েছে।
আপনি একটি জিনিসকে ভালোবাসলে তাকে বুঝতে কিংবা আত্মস্ত করতে সময় দিতে হবে। চর্চা করতে হবে। বিভিন্ন দিকে থেকে সেটি বিশ্লেষন করতে হবে। হঠাৎ করে আপনি একটি বই কিনবেন আর দু’একটা পাতায় চোখ রেখে বলবেন, উফ বুঝি না! এ পড়তে গেলে দাঁত পড়ে যাবে এমন কথা বলে অসভ্যের মতো হাসবেন, কবিতা এমন সস্তা এবং নির্বোধের বিষয় নয় আদৌ। কবিতা শিল্পের আশ্চর্য মাধুর্যম-িত একটি সুউচ্চ মাধ্যম যাতে সবচে কম কথায় সবচে বেশি প্রকাশের ঔদার্য নিহীত। ছোঁদো প্যানপেনে প্রেমের ক্ষেত্র এটি নয় আদৌ। এটি পড়ে চর্চা করে, আত্মস্থ করতে হবে। শিল্পের আনন্দ এবং উপকার পেতে হলে তাকে ভালোবাসতে হবে, তার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। শুধু শিল্প কেনো, গণিতের কথা ধরুণ, না বুঝলে আনন্দ নেই। বুঝতে পারলে আরো অনেক বিষয় সহজ হয়। সুতরাং অনুশীলন করতে হবে। সৃষ্টিশীল শিল্প যেমন পড়ে পাওয়া জিনিস নয়, তেমনি অর্থমূল্যে কেনা কোনো সুলভ বস্তুও নয়। দূর্বোধ্য বলার আগে একে ভালোভাবে গ্রহণ করতে হবে। ভালোবাসতে হবে। এর জন্য সময় দিয়ে হবে। পাঠক দূরে সরেছে বলেই কবিতা তার কাছে দূর্বোধ্য। তবে হ্যাঁ, সহজতরভাবে প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্ত্বপূর্ণ। অনেকের মধ্যে দূর্বোধ্যভাবে প্রকাশের মাধ্যমে ভারিক্কি চালের প্রবণতা যে নেই তা নয়। তবে তার পরিমাণ কম এবং শিল্পের বাইরে গিয়ে শুধু দুর্বোধ্যতা দিয়ে টিকে থাকা যায় না।
পাঠকের রুচি, কবির জনপ্রিয় হবার আপোসকামিতা এবং বাংলা কবিতার পাঠক
একজন কবি কোনো একটি সমাজের অঙ্গ। সে মানুষের জন্যই ওই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা করে না। সুতরাং পাঠক রুচির সাথে আপোষ করলে আসলে কবির মৃত্যু ঘটে যদি সে নিজের প্রাণের দাবী থেকেও জনরুচির বিষয়টি বিবেচনা করে লিখে থাকেন। প্রত্যেক শিল্পের জন্যই এটি গুরুত্ব বহন করে। কারণ এটি চানচুর নয়। কবি নিজের সঙ্গে বরং আপোষ করতে পারেন অন্যের জন্য নয়। শিল্পের জন্য আপোষ করলে কোন ভালো, মহৎ শিল্প সৃষ্টি হয় না। উদাহরণসহ দুজনের নাম উচ্চারণ করতে চাই। শ্রদ্ধা রেখেই বলছি হুমায়ুন আহমেদ এবং তসলিমা নাসরিন। এরা দুজনেই নিজেদের প্রতিনিয়ত খুন করেছেন। শিল্পের ক্ষতি করেছেন। অভাবনীয় মেধা ও লেখার শক্তি থাকার পরেও তারা জনরুচিকে এবং জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
- মাহমুদ টোকন
কবিতা কেন লিখি
এ প্রশ্নের জবাব দেয়া কঠিন এবং কোনো কবি আদৌ বাধ্য নন এর জবাব দিতে। এর উত্তর দিতে তিনি এমনকি প্রস্তুতও নন সবসময়। মুক্ত দর্শনে এবং অধিকার সংরক্ষিত সামাজিক অবস্থান থেকে কোন মা যেমন বাধ্য নন যে কেন তিনি সন্তান ধারণ করেন ও জন্ম দেন। বাণিজ্য-বেশাতিওয়ালারা জবাব দিলেও দিতে পারেন। কোন সৃষ্টিশীল মানুষ কারো কাছেই সৃষ্টিকর্মের কারণ ব্যাখ্যা করতে বাধ্য থাকেন না। এটি হবে তার জন্য আত্মঘাতি। যিনি সৃষ্টি করেন বা করবেন সেটি ফরমায়েসি হলে অবশ্য জবাব হতে পারে। ফরমায়েসি কাজ আদৌ কোন সৃষ্টিশীলতা নয়। কবির spontaneous overflow of powerful feelings কবিতার জন্ম দেয়। সেখানে একজন সৎকবি ঈশ্বর মাত্র। ঈশ্বর বরং কোন কোন ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী হতে পারেন কিন্তু তাকে সে কাজ করার কারণ জানতে চাওয়া শ্রেফ বোকামি অথবা ধৃষ্টতা।
স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিংবা স্বপ্রণোদিত হয়ে কোন কবি বা স্রষ্টা তার সৃষ্টির ’কেন’টিকে সামনে আনলেও আনতে পারেন। সেটি তার নিজস্ব ব্যাপার। তবে সে ব্যাখ্যা যথাযথ হবে কি-না বা আদৌ মনুষ্যসৃষ্ট যুক্তিবাদের অ্যানালিটিক্যাল দিক থেকে মর্যাদা পাবে কি-না এতে সন্দেহ রয়েছে। কারণ একজন কবি কিংবা কোন সৃষ্টিশীল মানুষ যতটা দার্শনিক ততটা মুখর তার্কিক নন। অন্যপ্রাণিরা হলেও হতে পারেন যেমনটি- সাম্প্রতিক উন্নয়ন(!) বিশেষজ্ঞরা সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অবিরাম বাক্য-তর্কের অভিনয় করে থাকেন। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে কবিতাই বরং কবিকে লিখে। আর এই ফর্ম থেকে আসলে ’কেন’ শব্দটি মহাজাগতিক একটি কণিকামাত্র যার অবস্থান রয়েছে বটে, অনিবার্যতা চোখেই পরে না।
আমার কথা যদি বলি সংক্ষেপে বলবো যে- একধরনের বোধ ও গভীর আনন্দের জন্য কবিতা লিখি। কবিতা লিখি গভীর বেদনার জন্য। আর ব্যাখ্যাহীন অন্তর্গত কিছু অসংলগ্নতাকে রূপ দেয়ার জন্য আমি কবিতা লিখি। আর একটি কথা- এ বিস্ময়কর মহাজগৎ, সমাজ, প্রকৃতি এবং এই প্রাণিকুলের প্রতি ভালোবাসা ও ভালোবাসাহীনতার জন্য কবিতা লিখি।
সকলেই কবি নন এবং কবিতা কোনো ঐশি বিষয় নয়
প্রত্যেক মানুষ তার ভেতরে অনুভুতিসম্পন্ন ইন্দ্রিয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। ইমোশন তার সহজাত। তবে প্রকাশ এবং প্রকাশভঙ্গি আলাদা। ব্যক্তি-সমাজ-রাস্ট্র-পরিবেশ এবং পরিবারভেদে এটি আরও ব্যতিক্রমি। একই মাছ তিনজন রান্না করলে তিন রকমের স্বাদ হবে। শুধু সেটুকুই নয় পরিবেশনেও এর পার্থক্য ষ্পষ্ট হয়ে ওঠে। চাইলে সবাই রান্না করতে পারেন কিন্তু সেটি কে কতোটা বিশেষ দক্ষতা দিয়ে ও মনোযোগ দিয়ে করেন সেটি হচ্ছে বিষয়। কে সকল অনুষঙ্গের সামঞ্জস্য বুঝে তার ব্যবহার করেন সেটি বিবেচ্য। সর্বতোভাবে সামঞ্জস্য থাকলেই কেবল রান্নাটি সুখাদ্য হয়। সে অর্থে ‘কেউ কেউ কবি’ এজন্য যে দু’একজন-ই প্রকৃতঅর্থে শিল্পি। এজন্যই সকলে কবি নন। একথা সত্যি যে সবাই সমান মেধা ও সুযোগ নিয়ে জন্মায় না। সবাই প্রতিভার লালন সমানভাবে করেনও না। মনে রাখা প্রয়োজন এটি শরীরগত একটি বিষয়। আর মন-মস্তিষ্ক শরীরেরই অংশ। কবিতা যিনি ভালো করে আত্মস্থ করে, চিন্তা-জ্ঞানের সমন্বয়ে প্রকাশের শৈল্পিক উৎকর্ষতা লাভ করাতে পারেন তিনিই কবি।
ভালোবেসে, গভীরভাবে বুঝে অনুশীলন করে এবং দরদ দিয়ে উপস্থাপনযোগ্য করতে পারলে তবেই কবিতা। সেজন্যই কেউ কেউ কবি। নইলে সাম্প্রতিককালে যে মোহের বিস্তার দেখছি তাতে বহু রাজনৈতিক, মিডিয়াকর্মী, এনজিও কর্মী, বই প্রকাশি নাম-যশোপ্রার্থীরা এমনকি বিত্তশালী-ক্ষমতাশালী-ব্যবসায়ী সকলেই কবি হতেন। শুধু শব্দ তৈরি করে মিডিয়া বা বইয়ে প্রকাশ করলেই যেমন কবিতা হয় না, তেমনি কবিতা ভালো বুঝলে এবং কবিতা বিষয়ক ওজনদার কথা বলতে পারলেই কবি হওয়া যায় না।
একবার কথা প্রসঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কি মহামতি লেনিনকে বলেন যে, ভালো গদ্য লেখার চেয়ে পদ্য লেখা বরং সহজ কাজ। এতে সময়ও কম লাগে। লেনিন সেকথা শুনে তো রেগে আগুন। বলেন, ’থাক ও কথা আমাকে শুনিও না। কবিতা লেখা মোটেও সহজ কাজ নয়। আমি তো ভাবতেই পারি না। জ্যান্ত ছাল-চামড়া ছাড়িয়ে নিলেও আমাকে দিয়ে তুমি কবিতার দুটো লাইন বের করতে পারবে না!’ লেলিন কিন্তু চাইলেই লিখতে পারতেন। সেই মেধাও তার ছিলো। কিন্তু সেটি মুখ্য নয়। বিষয়টি হচ্ছে কবিতা ও কবির প্রতি তার ধারণা ও সম্ভ্রম। এটি যে সহজ কোনো বিষয় বা ছেলেখেলা নয় এটি লেনিন দৃঢ়ভাবে বোঝাতে চেয়েছেন।
বিষয়টিকে যথাযথভাবে আত্মস্থ করে, শিল্পের কলাকৌশল জেনে এর জন্য নিবেদিত প্রাণে উৎকর্ষতা লাভ করলেই কবি হওয়া যায়। এটি আদৌ কোন ঐশী বিষয় বা আলৌকিক বিষয় নয়। আবার ক্ষমতা, পারিষদবেষ্টিত হয়ে ও অর্থসম্পদের মাধ্যমে অর্জিত (উদা: জেনারেল হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ) কোন বস্তুও নয়। অসাধারণ মেধাসম্পন্ন কেউ কেউ হয়ত খুব অল্প আয়াসে কবি হতে পারেন কিন্তু বিষয়টি সে-ই শরীরবৃত্তিয় অঙ্গের সুসক্ষমতা এবং সুযোগ প্রাপ্তির মানদ-ে হতে পারে। এর উদাহরন খুব কম। কবি হয়ে উঠতে হয়। মনে মেধায়, চেতনা ও অধ্যয়নের মধ্যে দিয়ে। এবং যথাযথ লেখা ও প্রকাশের মধ্যে দিয়ে।
কবিতায় ছন্দের প্রয়োজনীয়তা ও অনিবার্যতা এবং ছন্দবিমুখতা
কোনো সচেতন কবি ছন্দবিমুখ বলে মনে হয় না আমার। যিনি ছন্দ জানেন, বোঝেন তিনি কেন ছন্দবিমুখ হবেন? হতে পারে তিনি ছন্দের ব্যবহার কম করছেন বা ছন্দরীতি ভাঙছেন। গদ্য কবিতায়ও স্পষ্ট ছন্দের ব্যবহার রয়েছে। হয়ত ছন্দ কবিতায় প্রকট হয়ে ওঠেনি। কথা হচ্ছে, যিনি ছন্দ জানেন তিনি ছন্দকে ভাঙতেও জানেন। অন্যফর্মে তার ব্যবহারও জানেন। যার ধারণা নেই তিনি ছন্দবিমুখ হলেও হতে পারেন। আপনি যদি পল এলুয়ার এবং বোদলেয়ারের কবিতা দেখেন এর ষ্পষ্টতা দেখবেন। দুজনই তীক্ষè, ক্ষুরধার। ঠিক রবীন্দ্রনাথ এবং জীবনানন্দ একই রকম। ওনারা সবাই প্রাজ্ঞ কিন্তু ব্যবহারে একেকজন তার নিজের মতো। আলাদা।
সম্প্রতিক সময়ের কবিদের মধ্যে ছন্দবিমুখতার কোন ছাপ দেখছি না। বরং ছন্দকে চমৎকারভাবে মাইল্ডলি ব্যবহার করতে দেখি। আর যারা ছন্দ কী জানেন না, তারা বিমুখ হবেন, এটি সেটিও চোখে পড়ে। প্রকৃত ছন্দ জানা কবি ছন্দবিমুখ বলে আমার মনে হয় না। যেমন অনেকে ভালো ইংরেজি জানেন কিন্তু এড়িয়ে যান, অনর্গল বলেন না। তার মানে এই নয় সে বিমুখ। সে বাংলা বলেন, এখানে সে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন কিংবা তিনি বাংলায়ই বলতে চান। এটি ব্যক্তির ওপর। তবে বিমুখতা বলতে আমি অপছন্দ করা এবং বিরোধীতাকে মনে করি। কোনো কবি এমন আছেন বলে আমার মনে হয় না। ছন্দ হচ্ছে গানের স্বারগাম এর মতো। জেনে তবে আপনি গান গাইতে পারবেন। গলার এবং সুরের ও কথার ব্যবহার করেত পারবেন ইচ্ছে মতো। ফর্ম ভাঙাগড়ায় নিজেকে উৎকর্ষতা দিতে পারবেন।
কবিতার জন্য ছন্দ কতোটুকু প্রয়েজন এর জন্য কোনো ছন্দমিটার নেই। তবে ভালো গদ্যকবিতা লিখতে হলেও কবিকে অবশ্যই ছন্দের ধারণা থাকা দরকার। এজন্য যে ছন্দের ব্যবহার জেনেই ব্যবহার না করার উৎকর্ষতায় পৌঁছনো সম্ভব। আব্যশকতাটি এখানেই। আগে অনেকেই হয়ত এ বিষয়ে পড়ালেখা করেননি কিন্তু ব্যবহারের মাধ্যমে তারা এটি অর্জন করেছেন। আমি বলবো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপার-স্যাপার এক্ষেত্রে সবসময় মুখ্য নয়। মুখ্য হলো কবি এটি জানেন, বোঝেন কি-না। জানলে, কবিতায় আরো ভালো করে এর ব্যবহার বা পরিহার করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে আবশ্যক অনাবশ্যক বিষয়গুলো শ্রেফ কবির ওপর। ছন্দ জানলে, বুঝলে এটি প্রতিবন্ধকতার কোনো বিষয় হতে পারে না। এটি সাপ নয় যে ভালো সাপুরে হলেও, সাপ তার মৃত্যুর কারন হতে পারে!
কবিতায় ‘দশক’ ভাবনা, নিজের কবিতাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উপদান ইত্যাদি আমি আসলে ’দশক’ বিষয়টি আদৌ গ্রহণ করি না। তবে দেখা গেছে সর্টিং করার ক্ষেত্রে একটি দরকার হয়। বছর দু’য়েক আগে কোলকাতার একটি লিটলম্যাগে ভারতীয় (বিশেষকরে পশ্চিমবঙ্গ) বাঙালি ও বাংলাদেশের ’৯০-এর কবিদের নিয়ে একটি সংখ্যা করে। তো সম্পাদক মহোদয় আমাকে বাংলাদেশের দায়ীত্ব নিতে বলেন। আমি বলেছি যে এটি আমার জন্য নয় কারণ দশক দিয়ে আমি কবিকে ভাগ করতে পারি না। উনি বলেছিলেন যে উনিও সেটি করেন না। তবে নব্বই এর দশকে যারা কবি হিসেবে প্রকাশিত তাদেরকে সহযে চিহ্নিত করা ও প্রকাশ করার জন্য এটি হতে পারে। কারণ একসঙে সকল বাঙালি কবির কবিতা ওই ছোট পত্রিকাটিতে প্রকাশ করা খুবই কষ্টকর এবং ব্যয়বহুল। ফলে ওই নির্দিষ্ট সময়ে যারা আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তাদের আমরা সহজে গ্রন্থভুক্ত করতে পারি। এটি হলেও হতে পারে। তবে এপথ নির্বাচনের জন্য সহজ নয়। কারণ বেশিরভাগ কবির আত্মপ্রকাশ অগোচরে হয়ে থাকে।
আপনি যদি বাংলা কবিতার উত্তোরণ ও প্রকাশের সময়কাল বলেন তাহলে ঠিক আছে। এভাবেও আসলে চিহ্নিত করা কঠিন। বাংলা কবিতার জন্য প্রাচীনকাল থেকে এখনকার সময়টুকুও গুরুত্ত্ব বহন করে। প্রাচীনকালের লুইপা, কাহ্নপা থেকে এমনকি আজকে প্রকাশিত কবিও এখানে উল্লেখযোগ্য। বিষয়টি হচ্ছে প্রকাশের এবং উত্তোরণের। আমরা কতটুকু অগ্রগামি হতে পেরেছি। কতটুকু কবিতায় আছি, এর বিস্তার এবং মান, এর চর্চা এবং প্রকাশ কতটা উৎকর্ষতা লাভ করেছে। দশক থেকে আমার কাছে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সার্থক কবি ও কবিতার প্রকাশ।
আমি কবিতাকে দেখি অন্তর্গত ঐশ্বর্য দিয়ে। সেখানে নিজের সামর্থটুকু উপস্থাপন করতে চাই নিজের মতো করে। তাতে কখনও কারো কারো প্রভাব থাকে, তাকে অতিক্রম করার শক্তির ব্যবহারও থাকে। আমি দায়বদ্ধতা, দায়হীনতা ও গভীর আনন্দ-বেদনাকে আশ্রয় করে কবিতা লিখি। তার ছাপ রয়েছে আমার কবিতায়। তবে আলাদাকরে চিহ্নিত করার বিষয়টি নিয়ে নিজে ভাবিনি। কোনো কবিতা গভীর বেদনার ভেতর দিয়ে এমনকি কাঁদতে কাঁদতে লিখেছি। চোখের জলের চিহ্ন সেখানে নেই কিন্তু অ্যাগোনিটুকু রয়ে গেছে। আবার কোনো কবিতা অনাবিল আনন্দের মধ্যে লিখেও সেখানে গভীর আনন্দটুকু ধরতে পারিনি। শিল্প এরকমই। নিজের কবিতার উপাদান চিহ্নিত করার দায়ীত্ব কবির নিজের নয়। এটি পাঠকের, কবিতা সমালোচকদের।
প্রেক্ষিত এবং ঘটনা প্রবাহে দেশভাগের পরে পশ্চিমবাংলা এবং বাংলাদেশের কবিতার পার্থক্য এবং ঘটনার প্রভাব
দেশভাগ অর্থ্যাৎ ভারত ভাগ হলো ’৪৭ এ ভারত ও পাকিস্তান নামে। তারপর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো পাকিস্তানি উপনিবেশ থেকে। বলা ভালো- জীবন দিয়ে, অত্যাচার সয়ে, ত্যাগ স্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তানী শাসক হায়েনা ও তাদের এদেশী সহযোগিদের পরাজিত করেছি। স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আদর্শ। জিন্নাহ, নেহেরু এরা নিজেদের স্বার্থে ভারতবর্ষকে ধর্মের চাতুরিতে ভাগ করেছিলেন। ওই দু’ব্যক্তির একজনও বাঙালি ছিলেন না। সেজন্য তারা বাঙালিদের স্বার্থও দেখেননি। বরং বাঙালিদের কৌশলে বিভাজিত করেছেন। বাঙালিদের হঠিয়ে সামনে এসেছেন। আর বেনিয়া র্যাডক্লিফ এর ছুড়িটি শানানো ছিলোই বাঙালিদের কেটে ভাগ করার জন্য। কারণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে বাঙালিরা এবং পাঞ্জাবিরা অধিংকাশক্ষেত্রে প্রতিরোধ এবং আন্দোলনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে সেজন্য হিংসা চরিতার্থ করতে ইংরেজরা বাংলা এবং পাঞ্জাবকে টুকরো করেছে। তার অর্ধেক নিয়েছিলো জিন্নাহ, অর্ধেক নেহেরু। আরও একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে ভারত এবং পাকিস্থান স্বাধীনতা অর্জন করেনি। স্বাধীনতা তারা অনেকটা দান হিসেবে পেয়েছে। ‘ঠিক যেনো পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা’। আর বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। জীবনদান, অত্যাচার এবং নারীর সম্ভ্রমহানীর বহুবেদনা রয়েছে। এসবের বিনিময়ে লড়াই কওে জনযুদ্ধেও মাধ্যবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সুতরাং এর একটি বিরাট সিগনিফিকেন্স কিন্তু রয়েছে। স্বাবাভিকভাবেই বাংলাদেশের কবিতায় ও সাহিত্যে এর প্রভাব থাকবে। কারন সমাজ, প্রকৃতি এবং জীবন হচ্ছে সকল শিল্পের মুখ্য উপাদান। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাঙালিদের অর্থ্যাৎ বিভাজীত বাঙালিদের কবিতায় অবশ্যই মৌলিক পার্থক্য সূচিত হবে। কবিতা সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করেই উৎসারিত যার মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার, রাস্ট্র, পরিবেশ এবং অন্যান্য অনুসঙ্গগুলো প্রকাশিত হয়।
মনে রাখতে হবে ’৪৭ এর ভাগাভাগির ফলে যারা ওপারে গিয়েছেন তারমধ্যে বাংলাদেশের অনেক সাংস্কৃতিক পরিবার চলে গিয়েছেন। এদের মধ্যে কবি-সাহিত্যিকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। যদি আপনি ওখানকার কবি-সাহিত্যিকদের লক্ষ্য করেন বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কিন্তু ওপার থেকে যারা বাংলাদেশে এসেছেন সে তুলনায় কবি-সাহিত্যিক অনেক অনেক কম। আর তাদের মধ্যে অনেকে মেধাবী ছিলেন না কেবল শূন্যস্থান পূরণ করেছেন তা-ও কিন্তু এখন স্পষ্ট। যাহোক সে কারণে আমাদের স্বাধীনতার মতো একটি বিশাল অর্জনের পরেও আমাদের এখানে যে পরিমাণ পরিবর্তন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বিশেষকরে কবিতায় হতে পারতো তা হয়নি। তা থেকেও বড় বিবেচ্য বিষয় আমাদের সাংস্কৃতিতে বিরাট কালোছায়া, সূদীর্ঘ সামরিক শাসন এবং স্বৈরশাসন। ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে সামরিক শাসনের মধ্যে দিয়ে আমাদের বরং প্রগতির ধারাকেই রুদ্ধ করা হয়েছে। সিনেমা, গল্প-উপন্যাস, সঙ্গীতসহ অন্যান্য সংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোসহ কবিতা সেখানে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দীর্ঘকাল কোন দেশ সামরিক বা স্বৈরশাসন এর কবলে থাকলে সেখানে সর্বস্তরে মূল্যবোধের ধ্বস নামে। প্রগতিশীলতা খুন হয়। যার স্খলন আমরা দেখছি আমাদের শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পিসহ অন্যান্যদের মধ্যে।
আরেকটি বিষয় এর সাথে জড়িত যেটি ফিলোজফিক্যালি এবং সমাজবিজ্ঞানের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া এবং একরৈখিক বিশ্ব তৈরি হওয়া। সোভিয়েত রাশিয়া সারাবিশ্বে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করেছিলো। কিন্তু সেই জ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগসমূহ থমকে পরে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনে আমেরিকা ও পুঁজিবাদের প্রদত্ত কনজুমারিজম লকলকেভাবে বিশ্বকে গ্রাস করে। আর আমাদের মতো অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল এবং শিক্ষা-প্রযুক্তিতে পেছনে থাকা দেশগুলো এতে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ফলে বাংলাদেশের কবিতা, নাটক, সিনেমা, সাংবাদিকতা ইত্যাদিসহ শিল্প-সাহিত্য এবং রাজনীতি প্রবল সম্ভাবনা স্বত্ত্বেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমরা আমাদের কাঙ্খিত স্তরে পৌঁছতে পারিনি। সত্যি বলতে কি, দেখবেন যারা এখানে শিল্প-সাহিত্যের মডেল হতে পারতেন তারাই বরং ধনীক শ্রেণীর প্রতিভূ হয়ে বসেছেন। অর্থ্যাৎ সেই সুদীর্ঘ অপশাসন আর পুঁজির গন্ধম কবি-সাহিত্যিকদের সামগ্রিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার দিকে থেকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে অনেক বেশি। বাংলাদেশ শিক্ষা, যোগাযোগ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসহ অনেকক্ষেত্রে দারুন অগ্রগতি সাধন করেছে। কিন্তু সংস্কৃতি তথা সার্বিক মূল্যবোধ এখানে ভীষনরকম ক্ষতগ্রস্থ। বিশাল অর্জনও এরফলে ম্লান হয়ে পড়েছে বিভিন্নভাবে।
পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতীয় বাঙালীদের ক্ষেত্রে তারা যতটুকু পৌঁছবার কথা সেটি না পৌঁছলেও সাহিত্যে বিশেষকরে কবিতায় তারা নিশ্চয়ই কিছুটা প্রভাব ফেলতে পেরেছেন ওই পরিবর্তনগুলোর, সময়ের। আর ভারতে রাস্ট্রিয় চরিত্রের কাঠামোতে পড়ে অন্যান্যদের মতো বাঙালিরা সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে উঠে আসতে পারেনি। কবিতা তথা সামগ্রিক সাহিত্যের অর্জনেও সেখানে ছেদ পড়েছে। ভারত রাস্ট্রিয়ভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠায় তাদের মধ্যে সুবিধাবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের কৌশল ডালপালা মেলেছে। এর প্রভাব কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেখক-সাহিত্যিকদের মধ্যেও সংক্রমিত হবে এটিই স্বাভাবিক।
সাম্প্রতিক কবিতার দুর্বোধ্যতা এবং জনবিচ্ছিন্নতা
কবিতা নয় বরং শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমগুলোও এ অভিযোগের বাইরে নয়। আর সারা পৃথিবী জুড়েই এই আঙুল উঠেছে। কিন্তু পাঠকেরা কি সেই আগের পাঠক রয়েছেন? তারা কি কবিতার জন্য সময় দিচ্ছেন। কবিতা আত্মস্থ করতে তারা কি গুরত্বেও সঙ্গে বিষয়টিকে গ্রহণ করছেন? আগে বিনোদন ও শিল্পের প্রচার মাধ্যম ছিল অনেক কম। আর মানুষ ক’টা বই বা ম্যাগজিন হাতের কাছে পেতো? পাশাপাশি মানুষের কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিধী ছোট থাকায় অখ- অবসরও ছিলো। ফলে একটি বিষয় বা পুস্তকের অধ্যয়ন অধিকবার হওয়া ছিল অনিবার্য। আর সে সময়ে কিন্তু বাংলা কবিতায় বিষয়বৈচিত্র কম ছিল। দূরবর্তী জানালাটিও আজকের মতো খোলা ছিল না। আপনি যদি দেখেন একশ বছর আগে লেখা বোদলেয়ার, মালার্মে, র্যাবো, জীবনানন্দ আজও কী খুব সহযে আত্মস্থ করা যায়? আজকের কবিরা কিন্তু সে-ই দূরবর্তী পাঠটি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে পড়তে পারছেন, উপলব্দি করতে পারছেন এবং নিজে লিখতে পারছেন। সে সময়ের অনেক কবিই এ সুযোগগুলো পাননি। তাতে তারা কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যেই থেকেছেন। আজ যদি আপনি নজরুলের কবিতা পরেন তাহলে তার কটি কবিতাকে আপনি কালোত্তীর্ণ বলবেন? কিন্তু সেগুলো কম জনপ্রিয় নয়। সময়ের প্রয়োজনে তার অনেক কবিতাই বিস্ফোরক। এবং কবিতা ও লেখার জন্য ব্রিটিশদের হাতে তিনি কম নিগৃহিত হননি। তবুও কবিতাকে শিল্পের বিবেচনাবোধেই টিকে থাকতে হয়।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে সেলফোন, টেলিভিশন, ল্যাপটপ ও সোশ্যালমিডিয়া আর ইন্টারনেট বিনোদনের মাধ্যমে পাঠকরা এতোটাই এনগেজ হয়ে পড়েছেন যে কবিতার জন্য তার যথেষ্ট সময় কোথায়? আরও একটি বিষয় বিবেচ্য যে সোশ্যাল মিডিয়া রেসপনসিভ। ’লাইভ’ অনেক সস্তা বিনোদনও সেখানে রয়েছে। একটি বিশেষ সেকশন অর্থ্যাৎ যারা বই পড়ে তারা এই মোহে আবদ্ধ। আমার মনে আছে খুব ছোটবেলায় আমি রোজা রাখতাম। আর সেসময় সময় কাটত উপাসনা নয় বরং বড় বড় উপন্যাস, গল্প এবং প্রবন্ধ পড়ে। মনে আছে এডলফ হিটলার-এর মেনক্যাম্ফ এবং বিমল মিত্র-এর কড়ি দিয়ে কিনলাম এর মতো বই আমার ৮-১০ বছর বয়সে পড়া। ফোন, টেলিভিশন, নেট না থাকায়ই হয়ত তা সম্ভব হয়েছে।
আপনি একটি জিনিসকে ভালোবাসলে তাকে বুঝতে কিংবা আত্মস্ত করতে সময় দিতে হবে। চর্চা করতে হবে। বিভিন্ন দিকে থেকে সেটি বিশ্লেষন করতে হবে। হঠাৎ করে আপনি একটি বই কিনবেন আর দু’একটা পাতায় চোখ রেখে বলবেন, উফ বুঝি না! এ পড়তে গেলে দাঁত পড়ে যাবে এমন কথা বলে অসভ্যের মতো হাসবেন, কবিতা এমন সস্তা এবং নির্বোধের বিষয় নয় আদৌ। কবিতা শিল্পের আশ্চর্য মাধুর্যম-িত একটি সুউচ্চ মাধ্যম যাতে সবচে কম কথায় সবচে বেশি প্রকাশের ঔদার্য নিহীত। ছোঁদো প্যানপেনে প্রেমের ক্ষেত্র এটি নয় আদৌ। এটি পড়ে চর্চা করে, আত্মস্থ করতে হবে। শিল্পের আনন্দ এবং উপকার পেতে হলে তাকে ভালোবাসতে হবে, তার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। শুধু শিল্প কেনো, গণিতের কথা ধরুণ, না বুঝলে আনন্দ নেই। বুঝতে পারলে আরো অনেক বিষয় সহজ হয়। সুতরাং অনুশীলন করতে হবে। সৃষ্টিশীল শিল্প যেমন পড়ে পাওয়া জিনিস নয়, তেমনি অর্থমূল্যে কেনা কোনো সুলভ বস্তুও নয়। দূর্বোধ্য বলার আগে একে ভালোভাবে গ্রহণ করতে হবে। ভালোবাসতে হবে। এর জন্য সময় দিয়ে হবে। পাঠক দূরে সরেছে বলেই কবিতা তার কাছে দূর্বোধ্য। তবে হ্যাঁ, সহজতরভাবে প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্ত্বপূর্ণ। অনেকের মধ্যে দূর্বোধ্যভাবে প্রকাশের মাধ্যমে ভারিক্কি চালের প্রবণতা যে নেই তা নয়। তবে তার পরিমাণ কম এবং শিল্পের বাইরে গিয়ে শুধু দুর্বোধ্যতা দিয়ে টিকে থাকা যায় না।
পাঠকের রুচি, কবির জনপ্রিয় হবার আপোসকামিতা এবং বাংলা কবিতার পাঠক
একজন কবি কোনো একটি সমাজের অঙ্গ। সে মানুষের জন্যই ওই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে কিংবা করে না। সুতরাং পাঠক রুচির সাথে আপোষ করলে আসলে কবির মৃত্যু ঘটে যদি সে নিজের প্রাণের দাবী থেকেও জনরুচির বিষয়টি বিবেচনা করে লিখে থাকেন। প্রত্যেক শিল্পের জন্যই এটি গুরুত্ব বহন করে। কারণ এটি চানচুর নয়। কবি নিজের সঙ্গে বরং আপোষ করতে পারেন অন্যের জন্য নয়। শিল্পের জন্য আপোষ করলে কোন ভালো, মহৎ শিল্প সৃষ্টি হয় না। উদাহরণসহ দুজনের নাম উচ্চারণ করতে চাই। শ্রদ্ধা রেখেই বলছি হুমায়ুন আহমেদ এবং তসলিমা নাসরিন। এরা দুজনেই নিজেদের প্রতিনিয়ত খুন করেছেন। শিল্পের ক্ষতি করেছেন। অভাবনীয় মেধা ও লেখার শক্তি থাকার পরেও তারা জনরুচিকে এবং জনপ্রিয়তাকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।
‘বাংলা কবিতার পাঠক কারা?’ এর থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কবিতার পাঠক কারা। সারা পৃথিবীতেই কবিতার পঠক কমে গেছে। শিল্পের দেশ ফ্রান্সেও এটি প্রকট। পৃথিবীতে ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার জয়জয়কার। কবিতা তাই বলে বিপদগ্রস্তও নয়। বিপদগ্রস্ত তারা যার কবিতা পড়ে না। যারা শিল্প চর্চা করে না। শিল্প আপনার আত্মাকে জীবিত রাখে। আত্মাহীন মানুষ কখনো শান্তি লাভ করে না। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা কবিরাই কি খুব কবিতা পড়ছি? নিজের কবিতাটি ছাড়া অন্যের কবিতাটি পড়ার সময়ও যেন আমাদের নেই। এখানেও সেই সোশ্যাল মিডিয়া এবং মানুষের ধনলিপ্সা। পুঁজিবাদ আজকের দুনিয়াকে ভালেভাবেই গ্রাস করেছে এবং মানুষ আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তিকে সরিয়ে তার ধনার্জন এবং পণ্যের বিস্তাওে মনোনিবেশ করেছে। এ বিশদ আলোচনার বিষয়। তথাপিও
কবিতার পাঠক তারাই যারা কবিতা ভালোবাসেন। যারা নিজের আত্মার প্রশান্তি খোঁজেন এবং বুঝে না বুঝেও শিল্প চর্চা করেন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি মানুষকে প্রকৃত শান্তিময় জীবনের সন্ধান দেয়। সাম্য এবং সংস্কৃতির উদরেই মানুষ তার অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাবে। এতো অস্থিরতার মধ্যেও বাংলা কবিতার উৎকর্ষতা তবুও ষ্পষ্ট এবং পাঠকশ্রেণিও।
---
মাহমুদ টোকন
কবি-ঔপন্যাসিক, সম্পাদক। উন্নয়ন গবেষক ও অ্যাক্টিভিস্ট। জন্ম- ১১মার্চ ১৯৭১। গোপালপুর, মাদারীপুর। বর্তমান পেশা- গবেষণা ও উন্নয়নকর্ম। সম্পাদনা, সাংবাদিকতা ও কনসালটেনসি। প্রকাশিত গ্রন্থ- আত্মপ্রকাশ (কাব্যগ্রন্থ), আমার আকাশ আমার নদী (ছোটদের বই), জনজদিনের ঘ্রাণ (কাব্যগ্রন্থ/কোলকাতা থেকে প্রকাশিত), বিমূর্ত ইস্তেহার (কাব্যগ্রন্থ), Liberalism: A Closer Look (অ্যাকাডেমিক প্রকাশনা), মাটির স্বর্গ(উপন্যাস), রক্তফুলের দিন ( মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন